স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় দেরি করায় বাড়ছে ব্যয়, জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি। ভয়-লজ্জা কেড়ে নিচ্ছে স্তন ক্যানসার রোগীদের সুস্থতার সুযোগ।
স্তনে একটি ছোট গাঁট। শুরুতে তেমন গুরুত্ব দেননি। ভেবেছেন, কয়েক দিন পরই হয়তো সেরে যাবে। কারও কাছে বলতে লজ্জা পেয়েছেন, কেউ আবার ক্যানসার ধরা পড়ার ভয়ে চিকিৎসকের কাছেই যাননি। এভাবেই কেটে গেছে মাসের পর মাস। এরপর যখন হাসপাতালে পৌঁছেছেন, তখন অনেকের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ধাপে।
বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে এমনই উদ্বেগজনক বাস্তবতা উঠে এসেছে দেশের অন্যতম স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) এক গবেষণায়। গবেষণা বলছে, রোগের লক্ষণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে চূড়ান্ত চিকিৎসা শুরু করতে অর্ধেকেরও বেশি রোগীর চার মাসের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ বিলম্ব কমিয়ে দিচ্ছে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা, বাড়িয়ে দিচ্ছে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী হেলথ সায়েন্স রিপোর্টসে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ডিলেজ ইন ব্রেস্ট ক্যানসার ডায়াগনোসিস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ফ্যাসিলিটি-বেইজড ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ঢাকার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (NICRH) ৩৫৫ জন স্তন ক্যানসার রোগীর ওপর। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন বিআরএফের সায়েন্টিস্ট এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন। তার সঙ্গে ছিলেন মোহাম্মদ নাঈম হাসান, সুমাইয়া খান তৃষা ও অনকোলজিস্ট ড. মো. ওয়াহিদ আখতার।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৬ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়া থেকে চিকিৎসা শুরু হতে চার মাসের বেশি সময় লেগেছে। গবেষকরা একে ‘টোটাল ডিলে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ নারী নিজেরাই তিন মাসের বেশি সময় চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেছেন (‘পেশেন্ট ডিলে’)। আবার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা বিলম্বিত হয়েছে (‘প্রোভাইডার ডিলে’)।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, চিকিৎসকের কাছে প্রথমবার পৌঁছানোর সময় প্রায় অর্ধেক রোগী (৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ) ছিলেন ক্যানসারের দ্বিতীয় ধাপে, আর ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ ছিলেন তৃতীয় ধাপে। তৃতীয় ধাপের রোগীদের মধ্যেই চিকিৎসা বিলম্বের হার সবচেয়ে বেশি— ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক রোগীর ক্যানসার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে, যেখানে চিকিৎসা হয়ে ওঠে আরও জটিল, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত।
গবেষণাটি শুধু চিকিৎসা বিলম্বের চিত্রই তুলে ধরেনি, বরং এর পেছনের সামাজিক বাস্তবতাও সামনে এনেছে। প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, প্রথমে তারা ভেবেছিলেন স্তনের সমস্যাটি এমনিতেই সেরে যাবে। প্রায় ৭৬ শতাংশের ক্ষেত্রে ছিল অবহেলা। প্রায় ৬৬ শতাংশ অর্থাভাবে চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন। ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ নারী স্তন পরীক্ষা করাতে বা এ বিষয়ে কথা বলতে লজ্জাবোধ করেছেন। আর ৩৮ শতাংশ ক্যানসার ধরা পড়বে কিংবা কেমোথেরাপি নিতে হবে— এই আশঙ্কায় চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেছেন।
বিআরএফের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, চিকিৎসা বিলম্বের সঙ্গে শিক্ষা, আয় এবং বসবাসের স্থানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নিরক্ষর নারীদের চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত নারীদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। মাসিক পারিবারিক আয় পাঁচ হাজার টাকার কম হলে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের নারীদের চিকিৎসা বিলম্বের ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি। সবচেয়ে সংকটাপন্ন পরিস্থিতি রংপুর বিভাগে, যেখানে চিকিৎসা বিলম্বের ঝুঁকি প্রায় ছয় গুণ। এমনকি যেসব নারী স্বামীর সঙ্গে নিজের শারীরিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন, তাদের চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ার আশঙ্কাও দ্বিগুণের বেশি।
বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) গবেষকদের মতে, এই সংকট কাটাতে শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার। তাই তারা গ্রামাঞ্চলে স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি, স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, মোবাইল ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্ক্রিনিং ও রোগ নির্ণয় সেবা সম্প্রসারণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্যবিমার মতো আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছেন।
রিসার্চ পেপারটির প্রধান গবেষক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসার সফলতা যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, তেমনি কমে চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকিও।’
মূল গবেষণাপত্রের লিঙ্ক: https://onlinelibrary.wiley.com/doi/10.1002/hsr2.72718
- সৈয়ব আহমেদ সিয়াম
মিডিয়া সমন্বয়ক, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ)
ইমেইল: syeb.siyam@brfbd.org
إرسال تعليق