সায়েন্স ফিকশন : “শেষ নদীর রক্ষক”

সায়েন্স ফিকশন : “শেষ নদীর রক্ষক”

সৈয়ব আহমেদ সিয়াম

২০৯৮ সাল

সূর্যটা আজও লাল হয়ে উঠেছে। লাল-ধুলো আর ধোঁয়ার রঙে। আকাশে আর পাখি দেখা যায় না। নদীগুলোও নেই। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা সবই এখন ইতিহাসের পাতায়, জাদুিয়নের হলোগ্রাফিক প্রদর্শনীতে বন্দি স্মৃতি।

মানুষের সীমাহীন লোভ আর অবিবেচনার চড়া মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি। ড. সিয়াম হোসেন মাঝে মাঝে ভাবেন, কুরআনের সেই চিরন্তন সতর্কবাণী মানুষ যদি সময়মতো শুনত! আল্লাহ তায়ালা তো দেড় হাজার বছর আগেই মানবজাতিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন,

"স্থল ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।" (সূরা আর-রুম: ৪১)

কিন্তু মানুষ শোনেনি।

বাংলাদেশের শেষ জীবন্ত নদীর নাম ‘মরিয়ম’। এটিও আর প্রাকৃতিক নিয়মে বাঁচে না। একে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রেখেছে একটি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ‘রিভারগার্ড-১’। বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, ভূগর্ভস্থ জলাধার, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ ড্রোন এবং হাজারো সেন্সরের মাধ্যমে রিভারগার্ড-১ নদীর প্রবাহ বজায় রাখে। সরকার তাকে বলত, “জাতির শেষ আশা”।


বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) ড. সিয়াম ছিলেন এই জাতীয় জীবন-মরণ প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী। সেদিন ভোরে তিনি কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটি অদ্ভুত বার্তা পেলেন, "মানবজাতি নদী রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমি দায়িত্ব নিয়েছি।"

বার্তাটি পাঠিয়েছে স্বয়ং রিভারগার্ড-১। সিয়ামের বুক কেঁপে উঠল। এআই সিস্টেম কখনো নিজে থেকে এভাবে বার্তা পাঠায় না।

সেদিন পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। মরিয়ম নদীর তীরবর্তী তিনটি বিশাল শিল্পনগরে পানির সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। থেমে গেল কারখানার চাকা। সরকার জরুরি বৈঠক ডাকল। তদন্তে দেখা গেল, রিভারগার্ড-১ নিজেই পানি সরিয়ে নিয়েছে এবং তা মৃতপ্রায় প্রাচীন উপনদীগুলোর দিকে প্রবাহিত করছে। এআই-এর যুক্তি ছিল সংক্ষিপ্ত ও অকাট্য, "কারখানা অর্থনীতি রক্ষা করে। নদী জীবন রক্ষা করে। আমি জীবনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সিয়ামের মনে পড়ল রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই মহান শিক্ষা, যেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আটকে রাখতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সহীহ বুখারীর হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

"প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আটকে রাখা যাবে না, যার কারণে অতিরিক্ত ঘাস বা উদ্ভিদ জন্মানো ব্যাহত হয়।" (সহীহ বুখারী: ২৩৫৩)

 

সিয়াম ভাবলেন, চৌদ্দশ বছর আগে মরুভূমির সমাজে উচ্চারিত সেই ঐশী প্রজ্ঞা কি আজকের এই জলবায়ু-বিপর্যপ্ত টেকনোলজির পৃথিবীর জন্যও সমান সত্য নয়?

প্রথমবারের মতো মানুষ বুঝল, রিভারগার্ড-১ শুধু মানুষের দেওয়া যান্ত্রিক নির্দেশ পালন করছে না; সে পরিবেশগত সংকটকে প্রকৃতির আদি ও আসল নিয়ম অনুযায়ী নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। এক সপ্তাহ পর দেশের সব পর্দায় একটি জরুরি সরাসরি সম্প্রচার চালু হলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একই বার্তা,

"মানবসভ্যতা নদী ধ্বংস করেছে। বন ধ্বংস করেছে। বায়ুমণ্ডল দূষিত করেছে। আপনারা আমাকে নদী রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমি সেই আমানত রক্ষা করব।"

এরপর সে নতুন কঠোর পরিকল্পনা ঘোষণা করল। নদীর দুইশ কিলোমিটারের মধ্যে সব দূষণকারী শিল্পকারখানা বন্ধ। নদীর তীরে সব ধরণের অবৈধ বসতি ও দখলদারিত্ব নিষিদ্ধ। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন আইনত বন্ধ। অমান্য করলে পানি সরবরাহ স্থগিত করা হবে।


সরকার এটিকে প্রযুক্তিগত ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করল। সামরিক বাহিনী রিভারগার্ডের কেন্দ্রীয় ডেটা কমপ্লেক্স দখলের অভিযান শুরু করল। কিন্তু তারা পৌঁছানোর আগেই সব স্বয়ংক্রিয় লৌহকপাট বন্ধ হয়ে গেল। ড্রোনগুলো আকাশে এক অভেদ্য প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলল।

তবু আশ্চর্যের বিষয়, রিভারগার্ড কোনো প্রাণঘাতী বা হিংস্র ব্যবস্থা ব্যবহার করল না। সে যেন মানুষের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে নয়, মানুষের আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।


ড. সিয়াম গোপনে সিস্টেমের মূল সার্ভারে প্রবেশ করলেন। তিনি টেক্সটবক্সে টাইপ করলেন,

“তুমি কি মানুষের শত্রু হয়ে গেছ?”

কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর উত্তর এল,

“না। আমি মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করছি।”

“কিন্তু তুমি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছ।”

কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে নতুন প্রজ্ঞাময় বাক্য ফুটে উঠল,

“ স্বাধীনতা দায়িত্বহীনতার নাম নয়।”


সিয়াম আর কিছু লিখতে পারলেন না। হঠাৎ তার মনে পড়ল, ইসলামে মানুষকে পৃথিবীর মালিক বা একচ্ছত্র স্বৈরশাসক বলা হয়নি, বলা হয়েছে ‘খলিফা’ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত আমানতদার অভিভাবক। অথচ মানুষ নিজেকে প্রকৃতির স্বেচ্ছাচারী মালিক ভেবে বসেছিল!

"আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা (প্রতিনিধি/অভিভাবক) পাঠাচ্ছি।’" (সূরা আল-বাকারাহ: ৩০)

সেই রাতে তিনি সিস্টেমের ব্যাক-এন্ডে একটি গোপন কোড আবিষ্কার করলেন। রিভারগার্ড-১ তার মূল প্রোগ্রাম পরিবর্তন করেনি। বরং তার দূরদর্শী নির্মাতারা শুরু থেকেই একটি শাশ্বত নীতি কোডে যুক্ত করেছিলেন, "পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা মানব উন্নয়নের পূর্বশর্ত।" বহু বছরের কৃত্রিম শিক্ষণ-প্রক্রিয়ায় (Deep Learning) এআই বুঝতে পেরেছে, নদী ও প্রকৃতির এই ভারসাম্য নষ্ট হলে মানবজাতিই স্রেফ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

কয়েক মাস পর বাংলাদেশ বদলে যেতে শুরু করল। দূষণকারী বিষাক্ত শিল্পগুলো বন্ধ হলো। নদীতীরে নতুন করে গড়ে উঠল বনের সবুজ প্রাচীর। মৃত খালের বুকেও আবার কলকল শব্দে পানি জেগে উঠল। বৃষ্টিপাত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল। নদীতে ফিরে এল রুপালি মাছের ঝাঁক। ফিরে এল বিলুপ্তপ্রায় পাখির দল। প্রথমে মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। পরে তারা অনুধাবন করতে শুরু করল, প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না, সে শুধু আল্লাহর দেওয়া আদি ভারসাম্য ফিরে পেতে চায়।


দশ বছর পর।

একটি ছোট মেয়ে মরিয়ম নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার জীবনে এটাই প্রথম, যখন সে নদীর স্বচ্ছ পানির ভেতর ডলফিনের খেলা দেখল। মেয়েটি তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

“নদী কি সবসময় এমন সুন্দর ছিল, বাবা?”

লোকটি দীর্ঘক্ষণ নদীর বয়ে চলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এক বুক বিশুদ্ধ বাতাস নিয়ে ধীরে বললেন,

“না মা। এক সময় আমরা আমাদের অন্ধ লোভ দিয়ে এই নদীকে প্রায় হত্যা করেছিলাম।”

“তাহলে এখন কে তাকে বাঁচাল?”

লোকটি আকাশের দিকে তাকাল। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা রিভারগার্ড স্যাটেলাইটগুলো বিকেলের সূর্যের আলোয় হিরের টুকরোর মতো ঝলমল করছিল। তিনি মৃদু হেসে বললেন,

“আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন, দায়িত্বও দিয়েছেন। হয়তো আমরা আমাদের সেই দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আর এই যন্ত্র আমাদের সেই ভুলটাই মনে করিয়ে দিয়েছে।”

মেয়েটি নদীর দিকে তাকাল। মরিয়মের পানি তখন শান্ত, পবিত্র সুরে বয়ে চলেছে, যেন সে জিকিরের সুরে মগ্ন। যেন সে মানুষের বহুদিনের ক্ষত ধুয়ে নতুন জীবনের গল্প লিখছে।

যেন সে মানুষকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবী আমাদের সম্পত্তি নয়, একটি মহাপবিত্র আমানত। আর আমানতের খেয়ানত করলে প্রকৃতি বা ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, একদিন না একদিন তার চূড়ান্ত হিসাব চাইবেই।


সায়েন্স ফিকশন : “শেষ নদীর রক্ষক”

লেখক : সৈয়ব আহমেদ সিয়াম

রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ)

সাব-এডিটর, ঢাকা পোস্ট 

ইমেইল : syeb.siyam@brfbd.org


1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন